বিশেষ প্রতিনিধি | উখিয়া, কক্সবাজার
কক্সবাজারের উখিয়ায় পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে উদ্ধার করা বিপুল পরিমাণ ইয়াবা গায়েব, অস্ত্র তালিকায় না রাখা এবং অর্থ লেনদেনের এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। তবে পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, অভিযোগ খতিয়ে দেখে দোষীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের ক্ষোভ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড়
স্থানীয় যুবক ওসমান সরওয়ারের অভিযোগ, এক লাখ ইয়াবা গায়েব করার ঘটনাটি সত্য। ওই ঘটনায় অভিযুক্ত বালুখালী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই কিবরিয়া নাকি বলে বেড়াচ্ছেন— কেউ তার কিছু করতে পারবে না।
এদিকে, উদ্ধার করা ইয়াবার প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সাংবাদিক রফিক উদ্দিন। ফেসবুকে তিনি লেখেন, ‘৫০ হাজার নাকি ১ লাখ ৫০ হাজার?’ তার এই পোস্টের মন্তব্যে একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা দাবি করেন, উদ্ধার হওয়া ইয়াবার পরিমাণ ছিল দেড় লাখ পিস।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ১৭ আগস্ট এক মাদকবিরোধী র্যালিতে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ‘হয় মাদক ছাড়ুন, নইলে উখিয়া ছাড়ুন।’ তবে তাদের দাবি, এই হুংকার ছিল মূলত মাদককারবারিদের ভয় দেখিয়ে অনৈতিক সুবিধা আদায়ের একটি কৌশল মাত্র। উক্ত হুংকারের পরও এলাকাটিতে মাদকের বিস্তার কমেনি, বরং এলাকাটি মাদকের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।
আইনজীবীর উদ্বেগ
উখিয়া থানা পুলিশের পাঁচ সদস্যের বিরুদ্ধে ইয়াবা গায়েবের এই অভিযোগে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় আইনজীবী অ্যাডভোকেট জসিম আজাদ। তিনি বলেন, “উখিয়া থানা পুলিশের পাঁচ সদস্যের বিরুদ্ধে ইয়াবা গায়েবের অভিযোগটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যাদের দায়িত্ব মাদক নিয়ন্ত্রণ করা, তাদের বিরুদ্ধেই যদি জব্দ করা ইয়াবা গায়েব করার অভিযোগ ওঠে, তবে তা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক।”
মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “সরকার মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করলেও মাঠপর্যায়ে তার যথাযথ প্রতিফলন ঘটছে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।”
অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও থানা প্রশাসনের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে জানতে বালুখালী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই কিবরিয়াকে একাধিকবার কল করা হলেও শুরুতে তিনি ফোন ধরেননি। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে লিখিতভাবে অভিযোগের বিষয় জানিয়ে বক্তব্য চাওয়া হলেও কোনো উত্তর দেননি। প্রতিবেদন তৈরির সময় পুনরায় যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আপনি কী জন্য ফোন দিয়েছেন, আমি জানি। এই বিষয় নিয়ে গতকাল থেকে অন্তত ৫০টি কল পেয়েছি। আপনারা তদন্ত করে যা পান, তা লিখেন।” তবে উদ্ধার করা ইয়াবা গায়েব, অস্ত্র জব্দ তালিকায় না রাখা কিংবা অর্থ লেনদেনের বিষয়ে সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা দেননি তিনি।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মোবাইল ফোনে জানান, “আমি গত চার দিন থানায় ছিলাম না, ছুটিতে ছিলাম। এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হবে। তবে আমাকে জড়িয়ে যারা এ ধরনের প্রচার করছেন, তারা অপরাধ করছেন। আমরা এখানে মাদক নির্মূল করতে এসেছি।”
উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. অহিদুর রহমান বলেন, “আপনাদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছি। অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে কারো কাছে কোনো তথ্য-উপাত্ত থাকলে তা দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানাচ্ছি।”
অভিযানের বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি আরও যোগ করেন, “সাধারণত বিজিবি বা অন্যান্য কোনো বাহিনী মাদক জব্দ করলে ঢালাওভাবে এভাবে অভিযোগ প্রচার করা হয় না। কিন্তু পুলিশ কোনো অভিযান পরিচালনা করলেই এ ধরনের অভিযোগ ওঠে। এ কারণে উখিয়া-টেকনাফ এলাকায় দায়িত্ব পালন করতে অনেক কর্মকর্তা আগ্রহী হন না, এমনকি অভিযান পরিচালনা করতেও অনেকে ভয় পান। তারপরও বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছি।”